spot_img
spot_img

ফিলিস্তিনি শহীদদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চুরি করছে ইসরাইল

গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনি শহীদদের মৃতদেহ থেকে লিভার, কিডনি ও হার্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ চুরি করছে ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীদের অবৈধ রাষ্ট্র ইসরায়েলের সেনাবাহিনী। সেই সঙ্গে জব্দ করা মৃতদেহ থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে চোখের কর্নিয়ার পাশাপাশি শ্রবণে নিবেদিত অভ্যন্তরীণ কানের অংশ (কক্লিয়া)।

গাজ্জায় দায়িত্বরত বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এমন ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। যা নিয়ে রীতিমত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ জুড়ে মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘ইউরো মেড হিউম্যান রাইটস মনিটর।’ সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বাধীন তদন্তের দাবী জানিয়েছে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা ভিত্তিক এই সংস্থাটি।

অঙ্গ চুরির বিষয়ে গাজ্জার চিকিৎসকদের দাবি:

গত ৭ অক্টোবর থেকে গাজ্জা উপত্যকায় গণহত্যা শুরু করে দখলদার ইসরাইলী বাহিনী। এতে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি শহীদ হয়েছে।

দায়িত্বরত চিকিৎসকদের মতে, এই শহীদদের মধ্যে থেকে অতি ক্ষুদ্র একটি অংশকে গাজ্জার সবচেয়ে বড় আল শিফা হাসপাতালের সামনেই গণকবর দেয়া হয়েছিল। তবে তার ১০ দিন যেতে না যেতেই এই কবর খুঁড়ে সেখান থেকে মৃতদেহ জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায় ইসরাইলি সেনাবাহিনী।

এছাড়াও গাজ্জার দক্ষিণ অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা ও উত্তরে অবস্থিত ইন্দোনেশিয়া হাসপাতাল থেকেও মৃতদেহ জব্দ করা হয়।

পরবর্তীতে ফিলিস্তিনের রেড ক্রিসেন্টের কাছে বেশ কিছু মৃতদেহ হস্তান্তর করে দখলদার বাহিনী। এসব মৃতদেহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, মৃতদেহ থেকে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অনুপস্থিত রয়েছে।

বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে অঙ্গ চুরির অভিযোগ ও সত্যতা:

ফিলিস্তিনিদের মৃতদেহ থেকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অপসারণের অভিযোগ দখলদার ইসরাইলের বিরুদ্ধে নতুন কিছু নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এ বিষয়ে তথ্য ও প্রমাণসহ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

২০০৮ সালে ইসরাইলের অঙ্গ চুরির বিষয়ে একটি তদন্ত করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল সিএনএন। তদন্তে বলা হয়, “ধারনা করা হচ্ছে মানব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ চুরি ও অবৈধ ব্যবসার সবচেয়ে বড় কেন্দ্রস্থল ইসরাইল।”

২০১৪ সালে এ বিষয়ে আরো একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে ইসরাইলের একটি টেলিভিশন চ্যানেল। যেখানে অবৈধ দেশটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন মৃতদেহ থেকে চামড়া প্রতিস্থাপনের বিষয়টি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইলি সৈন্যদের পোড়া ও মারাত্মক জখমের চিকিৎসার জন্য ফিলিস্তিনি ও আফ্রিকার শ্রমিকদের মৃতদেহ থেকে চামড়া অপসারণ করা হয়েছিল।

প্রতিবেদনে ইসরাইলের কাছে ১৭০ বর্গমিটার মানব ত্বক বা চামড়া রিজার্ভ রয়েছে বলে স্বীকার করেন অবৈধ দেশটির ‘স্কিন ব্যাংকের’ প্রধান। যা ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি।

প্রসঙ্গত, অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দান করা থেকে বিরত থাকা নাগরিকদের মধ্যে বিশ্বে ইসরাইলিদের অবস্থান তৃতীয়। সে ক্ষেত্রে এই বিপুল ও অতিরিক্ত পরিমাণ চামড়ার রিজার্ভ কোথা থেকে আসলো তা এক নতুন রহস্যের দরজা উন্মোচন করে।

এবিষয়ে আরো জোরালো প্রমাণ দিয়েছেন ইসরাইলি ডাক্তার মেরা ওয়েইস। তার লিখিত বই “ওভার দ্য ডেড বডিস” এ বলা হয়েছে, ১৯৯৬ থেকে ২০০২ সালের মধ্যে মৃত ফিলিস্তিনিদের শরীর থেকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চুরি করা হয়, যা ইসরাইলি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চিকিৎসা গবেষণায় ব্যবহৃত ও দেশটির রোগীদের দেহেও প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল।

ইউরো মেড মনিটরের মতে, অবৈধভাবে মানব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বেচাকেনার বৃহত্তম কেন্দ্রগুলির মধ্যে অন্যতম ইসরাইল।

অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চুরির পক্ষে নেসেটে আইন পাস:

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, মৃত ফিলিস্তিনিদের মৃতদেহ ধরে রাখা ও তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চুরি করার বিষয়ে আইনি বৈধতা প্রদান করেছে দখলদার ইসরাইল।

২০১৯ সালে ‘সংখ্যা কবরস্থানে’ নামে গোপন সমাধিস্থলে অস্থায়ীভাবে মৃত ফিলিস্তিনিদের লাশ কবর দেওয়ার অনুমতি দিয়ে রায় দেয় সুপ্রিম কোর্ট। ২০২১ সালের শেষের দিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনী ও পুলিশকে মৃতদেহ ধরে রাখার অনুমতি দিয়ে আইন পাস করে নেসেট (পার্লামেন্ট)।

কত মৃতদেহ এখনো আটকে রেখেছে ইসরাইল:

ইউরো মেড মনিটরের তথ্য অনুযায়ী ইসরাইলের মর্গে এখনো ১৪৫ জন ফিলিস্তিনির মৃতদেহ রয়েছে। সেই সঙ্গে জর্দান সীমান্তের কাছে একটি গোপন কবরস্থানে ২৫৫ জন ফিলিস্তিনিকে কবর দেওয়া হয়েছে যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষেধ।

ফরেনসিক বিজ্ঞানের মাধ্যমে কি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চুরির বিষয়টি প্রমাণিত হয় ?

গাজ্জার বেশ কয়েকটি হাসপাতালের চিকিৎসকদের মতে, শুধুমাত্র ফরেনসিক বিজ্ঞানের মাধ্যমে কোন ব্যক্তির মৃতদেহ থেকে অঙ্গ অপসারণ করা হয়েছে কিনা তা প্রমানিত অথবা অপ্রমানিত করা যায় না। যেহেতু মৃত্যুর পূর্বে এসব মৃতদেহের অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দ্বারা অঙ্গ চুরির সম্ভাব্য বেশ কয়েকটি লক্ষণ সনাক্ত করা হয়েছে বলে ইউরো-মেড মনিটর দলকে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

অঙ্গ চুরির বিষয়ে দখলদার ইসরাইলের মন্তব্য:

অঙ্গ চুরির অভিযোগের বিষয়ে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এখনো পর্যন্ত কোন মন্তব্য করেনি তারা।

যদিও পূর্বের একটি বিবৃতি অনুযায়ী, পরিবারের সম্মতি ছাড়া মৃত ফিলিস্তিনিদের মৃতদেহ থেকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে ইসরাইলি কর্মকর্তারা। সেই সঙ্গে এই ধরনের অভিযোগকে এন্টি সেমেটিক বা ইহুদি বিদ্বেষ বলেও অভিহিত করা হয়েছে।

সূত্রঃ ইউরো নিউজ

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ