হাসিনার দুঃশাসন নিয়ে লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন কেইজ ইন্টারন্যাশনাল প্রণীত প্রতিবেদন ‘আউট অব দ্য শ্যাডো অব হাসিনা’ উপস্থাপন, পর্যালোচনা ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইনসাফের আয়োজনে রাজধানীর পুরানা পল্টনের ডিসিসি হলে অনুষ্ঠিত এ সভায় প্রতিবেদনটির মূল বিষয়বস্তু তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি উপস্থিত অতিথিদের অংশগ্রহণে তা নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা ও মতবিনিময় হয়।
মঙ্গলবার বিকাল ৩টা থেকে ইফতার পর্যন্ত আয়োজিত এ সভায় রাজধানীর বিভিন্ন অঙ্গনের আলেম, বুদ্ধিজীবী, গবেষক, রাজনীতিবিদ, গুমের শিকার ব্যক্তি ও সচেতন নাগরিকেরা অংশ নেন।
অনলাইনে সভায় যুক্ত হন কেইজ ইন্টারন্যাশনালের কেইজ ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক মুহাম্মাদ রাব্বানী। তিনি প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপট, আন্তর্জাতিক তাৎপর্য এবং বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এর গুরুত্ব তুলে ধরেন। এ ছাড়া প্রতিবেদনটির ওপর বিস্তারিত বক্তব্য রাখেন লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট শায়খ আহমাদ রফিক, লেখক ও চিন্তক আসিফ আদনান, কাউন্সিল অ্যাগেইনস্ট ইনজাস্টিসের প্রধান শের মুহাম্মাদ এবং গুমের ভুক্তভোগী মাসরুর আনওয়ার চৌধুরী।
আরও বক্তব্য দেন খেলাফত আন্দোলন একাংশের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম, হেফাজতে ইসলামের সহ-প্রচার সম্পাদক মুফতি শরিফুল্লাহ, জাতীয় লেখক পরিষদের সভাপতি সৈয়দ শামসুল হুদা, জমিয়তের প্রচার সম্পাদক মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী, বরখাস্ত নৌবাহিনী কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট ইনতিশার ইনজিমাম, বৈষম্যহীন কারামুক্তি আন্দোলনের সেক্রেটারি মুফতি শফিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ ইসলামিক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সেক্রেটারি মোফাজ্জল ইবনে মাহফুজ, এনসিপি নেতা মাওলানা সানাউল্লাহ খান, বৈষম্যহীন কারামুক্তি আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি আল-আমিন সাকী, গুমের ভুক্তভোগী সংবাদ উপস্থাপক সালিহিন কাদির, গুমের ভুক্তভোগী আরাফাত তানভীর প্রমুখ।
সভায় গুমের শিকার ব্যক্তিরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন। তারা জানান, বেআইনি আটক, গোপন বন্দিশালা, নির্যাতন, দীর্ঘ কারাবাস, সামাজিক চাপ এবং আইনি হয়রানির মধ্য দিয়ে তাদের ও তাদের পরিবারের জীবন গভীরভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।

কেইজের এ প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশে কীভাবে ধাপে ধাপে একটি সুসংগঠিত দমনপীড়নের ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তার বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে স্পষ্ট করা হয়েছে, সন্ত্রাস দমন ও জাতীয় নিরাপত্তার কথা সামনে আনা হলেও বাস্তবে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালকে ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক বিরোধী, সাংবাদিক, অ্যাক্টিভিস্ট, শিক্ষাবিদ, ধর্মীয় ব্যক্তি ও সাধারণ নাগরিকদের দমনের হাতিয়ার হিসেবে। আইনের ভাষা, বিচারিক কাঠামো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে ভিন্নমতকে অপরাধে পরিণত করা হয়েছে এবং সরকারের সমালোচকদের নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে, সেই চিত্রও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনটিতে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বিচারে আটক, গোপন বন্দিশালা, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি, নির্যাতন এবং বানোয়াট মামলার বিস্তৃত বিবরণ স্থান পেয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাবের ভূমিকা। এতে দেখানো হয়েছে, সন্ত্রাস দমনের নামে গঠিত এ বাহিনী ধীরে ধীরে রাজনৈতিক দমনপীড়নের কেন্দ্রীয় যন্ত্রে পরিণত হয়। গুম, কথিত ক্রসফায়ার, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে জনমনে কীভাবে ভয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, তাও এতে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। একই সঙ্গে বোঝানো হয়েছে, এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যত্যয় ছিল না; বরং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশ ছিল।
প্রতিবেদনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এতে শুধু সামগ্রিক অভিযোগ বা পরিসংখ্যান নয়, নির্দিষ্ট ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতাও সামনে আনা হয়েছে। মাওলানা আবুল হোসাইন আল-আমিন, আরাফাত তানভীর এবং মাসরুর আনওয়ার চৌধুরীর ঘটনার মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, কীভাবে একেক ধরনের মানুষকে একেক অজুহাতে টার্গেট করা হয়েছে। কারও ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয়, কারও ক্ষেত্রে অনলাইন কার্যক্রম, আবার কারও ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মত, সামাজিক অবস্থান বা সমালোচনামূলক বক্তব্যকে নিপীড়নের কারণ বানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে স্পষ্ট করা হয়েছে, গুম ও রাজনৈতিক বন্দিত্ব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; বরং তা ছিল রাষ্ট্রীয় দমনযন্ত্রেরই অংশ।

প্রতিবেদনটিতে আরও তুলে ধরা হয়েছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা ছিল না; বরং বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অন্যায়, দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, নাগরিক স্বাধীনতা হরণ এবং দমনপীড়নের বিরুদ্ধে মানুষের বিস্ফোরিত প্রতিরোধ ছিল এটি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও কূটনৈতিক প্রশ্রয়ের প্রশ্নও এতে সামনে আনা হয়েছে। সবশেষে জবাবদিহি, সত্য উদ্ঘাটন, আইনি সংস্কার, নিবর্তনমূলক আইন বাতিল, নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠন এবং ক্রান্তিকালীন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।












