spot_img
spot_img

আশেকে রাসূল গাজী ইলমুদ্দীন শহীদের পক্ষে জিন্নাহর ঐতিহাসিক আইনি লড়াই

উপমহাদেশের মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের নেতা হিসেবেই মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ সবচেয়ে বেশি পরিচিত। কিন্তু তার জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে আছে আশেকে রাসূল গাজী ইলমুদ্দীন শহীদের সঙ্গে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবমাননাকারী বইয়ের প্রকাশক রাজপালকে হত্যার দায়ে যখন গাজী ইলমুদ্দীন শহীদ ব্রিটিশদের ফাঁসির মুখোমুখি, তখন তার জীবন বাঁচাতে ঔপনিবেশিক আদালতে ঐতিহাসিক আইনি লড়াইয়ে নেমেছিলেন জিন্নাহ।

ঘটনার শুরু ‘রঙ্গিলা রাসূল’ নামের চরম অবমাননাকর একটি পুস্তিকাকে কেন্দ্র করে। আর্য সমাজপন্থী পণ্ডিত চমুপতি মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার পবিত্র পরিবারকে নিয়ে বইটি লেখে। লাহোরের হিন্দু প্রকাশক মহাশে রাজপাল সেটি প্রকাশ করে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন জঘন্য অবমাননায় উপমহাদেশের মুসলমানদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। রাজপালের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলেও ব্রিটিশ ভারতের আদালতে শেষ পর্যন্ত তার সাজা বাতিল হয়ে যায়।

এই প্রেক্ষাপটে ১৯২৯ সালের ৬ এপ্রিল লাহোরে রাজপালকে হত্যা করেন তরুণ মুসলিম ইলমুদ্দীন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে পরবর্তী সময়ে মুসলমানদের কাছে তিনি আশেকে রাসূল গাজী ইলমুদ্দীন শহীদ হিসেবে অমর হয়ে থাকেন।

ব্রিটিশ সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে। বিচারের পর লাহোরের সেশন আদালত ২২ মে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

ঠিক এখানেই ইতিহাসের মঞ্চে সামনে আসেন মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ।

তখন তিনি উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যারিস্টার। রাজনীতি ও আইনের জগতে তার খ্যাতি প্রতিষ্ঠিত। গাজী ইলমুদ্দীন শহীদের মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে লাহোর হাইকোর্টে আপিল হলে তার পক্ষে দাঁড়ান জিন্নাহ।

একজন আশেকে রাসূল তরুণের জীবন বাঁচাতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আদালতে নিজের আইনি দক্ষতা নিয়ে লড়াই শুরু করেন তিনি।

জিন্নাহ শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে মামলায় উপস্থিত হননি। রাষ্ট্রপক্ষের মামলার ভিত্তিই নড়বড়ে করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। সাক্ষীদের বিশ্বাসযোগ্যতা, তাদের বক্তব্যের অসঙ্গতি, গাজী ইলমুদ্দীন শহীদকে শনাক্ত করার প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রপক্ষের বিভিন্ন প্রমাণ নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন তোলেন।

জিন্নাহর লক্ষ্য ছিল গাজী ইলমুদ্দীন শহীদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের দুর্বলতাগুলো আদালতের সামনে স্পষ্ট করা এবং তার মৃত্যুদণ্ড ঠেকানো।

কিন্তু তার আইনি লড়াইয়ের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ সামনে আসে মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্নে।

জিন্নাহ ব্রিটিশ বিচারকদের সামনে গাজী ইলমুদ্দীন শহীদের অল্প বয়সের বিষয়টি তুলে ধরেন। তার বয়স তখন মাত্র ১৯ থেকে ২০ বছর। একই সঙ্গে তিনি আদালতের সামনে তুলে ধরেন সেই প্রেক্ষাপটও, যে প্রেক্ষাপটে একজন তরুণ মুসলিম নিজের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবমাননায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন।

অর্থাৎ গাজী ইলমুদ্দীন শহীদের রাসূলপ্রেমকে জিন্নাহ লুকানোর চেষ্টা করেননি। বরং নিজের নবীর প্রতি তার গভীর ভালোবাসা এবং নবী অবমাননায় সৃষ্ট ক্ষোভকে মৃত্যুদণ্ড লঘু করার পক্ষে আইনি যুক্তি হিসেবে ব্রিটিশ আদালতের সামনেই তুলে ধরেন।

এখানেই জিন্নাহর ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি এমন এক তরুণের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন, যিনি মুসলিমদের কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মান রক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন।

জিন্নাহ আইনের প্রতিটি সুযোগ ব্যবহার করেছিলেন। প্রথমে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যপ্রমাণকে চ্যালেঞ্জ করেন। এরপর মৃত্যুদণ্ড বাতিলের চেষ্টা করেন। শেষ পর্যায়ে গাজী ইলমুদ্দীন শহীদের বয়স, মানসিক অবস্থা ও রাসূলপ্রেমের প্রেক্ষাপট সামনে এনে তার প্রাণ রক্ষার আবেদন জানান।

কিন্তু ব্রিটিশ আদালত জিন্নাহর যুক্তি গ্রহণ করেনি। ১৯২৯ সালের ১৭ জুলাই লাহোর হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে।

এরপরও গাজী ইলমুদ্দীন শহীদকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ৩১ অক্টোবর মিয়ানওয়ালী কারাগারে তার ফাঁসি কার্যকর করে ব্রিটিশ সরকার।

তার শাহাদাতের পর মরদেহ লাহোরে ফিরিয়ে আনার দাবিতেও মুসলমানরা আন্দোলন করেন। আল্লামা মুহাম্মাদ ইকবালসহ মুসলিম নেতাদের প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত তার মরদেহ লাহোরে এনে পুনরায় দাফন করা হয়।

গাজী ইলমুদ্দীন শহীদের এই ঘটনা মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহর জীবনেরও এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

পরবর্তী সময়ে যে জিন্নাহ ভারতবর্ষের মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রধান কণ্ঠে পরিণত হন, তার বহু আগেই মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতির এমন এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে তাকে দেখা যায় একজন আশেকে রাসূল তরুণের পাশে।

একদিকে ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক বিচারব্যবস্থা, অন্যদিকে ফাঁসির অপেক্ষায় গাজী ইলমুদ্দীন শহীদ। সেই কঠিন মুহূর্তে আদালতের ভেতরে তার পক্ষে লড়াইয়ের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ।

গাজী ইলমুদ্দীন শহীদের রাসূলপ্রেম যেমন মুসলিম ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে, তেমনি তাকে ফাঁসির হাত থেকে বাঁচাতে ব্রিটিশ আদালতে জিন্নাহর সেই ঐতিহাসিক আইনি লড়াইও তার মুসলিমপন্থী রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হয়ে আছে।

সূত্র : লাহোর হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ