পৃথিবীর ৫০ শতাংশ মেডজুল খেজুরের চাহিদা মেটানো ফিলিস্তিনি মেডজুল ও এর বিশ্ববাজার শতভাগ দখলে নিয়েছে ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীদের অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল।
সম্প্রতি আনাদোলু ও মিডল ইস্ট মনিটরের এক প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে আসে।
প্রতিবেদন অনুসারে, প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে পৃথিবীর ৫০ শতাংশ মেডজুল খেজুরের চাহিদার জোগান দিচ্ছে ইসরাইল, যার বর্তমান বাজার মূল্য ১৭.৩৫ বিলিয়ন ডলার। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের ভূমি দখলে নিয়ে এই প্রতারণা ও অপরাধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে গাজ্জায় গণহত্যা চালিয়ে যাওয়া ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীদের অবৈধ রাষ্ট্রটি।
দখলকৃত ফিলিস্তিনের আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত সরকারের একটি বার্তা এই অভিযোগকে আরো দৃঢ় করে। বিশ্বের সকল মেডজুল ক্রেতাদের প্রতারিত হওয়া থেকে সতর্ক থাকার আহবান জানানো সেই বার্তায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জানায়, পশ্চিম তীরের জেরিকো অঞ্চলে জমি দখলে নিয়ে উৎপাদন করা মেডজুল খেজুর ফিলিস্তিনের স্থানীয় পণ্য হিসেবে বাজারজাত করছে ইসরাইল। প্রতারিত না হতে ক্রেতারা যেনো মেডজুল কেনার সময় বারকোড ভালোভাবে পরীক্ষা করে নেন।
সিবিআইয়ের ন্যায় খেজুর সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, খেজুরের মধ্যে মেডজুল খুবই প্রিমিয়াম এবং উচ্চ মুল্যে বিক্রিত হয়ে থাকে। এটি অন্যান্য খেজুরগুলোর তুলনায় আকারে বড়, অধিক রসালো, মজাদার ও শক্তিবর্ধকও হয়ে থাকে। তাই ইউরোপ ও আমেরিকাতে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। মেডজুলের বিশ্ববাজারের বড় অংশও তাই ইউরোপ ও আমেরিকা।
সিবিআইয়ের তথ্য অনুসারে, ইউরোপে আমদানি করা মেডজুল খেজুরের প্রায় ৫০ শতাংশই ইসরাইল থেকে আসে। তবে আন্তর্জাতিক খাদ্য ও বাণিজ্য সাময়িকীগুলোর তথ্যমতে, এর পরিমাণ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
যেভাবে প্রতারণা করছে ইসরাইল:
বিশ্বব্যাপী ভোক্তাগণ ইসরাইলী পণ্য বয়কট অব্যাহত রাখায় মেডজুল রপ্তানিতে লেবেলিং প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে অবৈধ রাষ্ট্রটি এবং বিধিনিষেধের বেড়াজাল থেকে মুক্ত থাকতে ব্যবহার করছে তৃতীয় কোনো দেশকে।
সংশ্লিষ্টজনেরা অভিযোগ করেন, ইউরোপে আমদানি করা খেজুরের বড় অংশই আসে ইসরাইল দখলকৃত ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতিভিত্তিক বাগান থেকে। কিন্তু বাজারজাত করার সময় লেবেলিংয়ে উৎসমূল স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হচ্ছে না।
অভিযোগে আরো বলা হয়, উৎস গোপন রাখা এসব খেজুরের অধিকাংশই তৃতীয় আরেকটি দেশের মাধ্যমে ইউরোপের বাজারে প্রবেশ করে। সরাসরি রপ্তানির বদলে ভিন্ন কোনো দেশ বা পরোক্ষ পরিবহনপথ ব্যবহার করে ইউরোপে পাঠানো হচ্ছে।
পশ্চিম তীর থেকে নিজেদের উৎপাদিত যেকোনো পণ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে প্রবেশের করানোর সময় ইসরাইল কখনো শুধু ‘ইসরাইলী পণ্য’ হিসেবে লেবেল করছে। আবার কখনো প্রতিবেশী কোনো দেশের পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করছে। তা যে ৬৭ সীমা অনুযায়ী ইসরাইল হিসেবে বিবেচিত অংশে উৎপাদিত নয়, সেই বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে।
কিছু রপ্তানিকারক মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে পণ্য পুনরায় প্যাকেটজাত করছেন অথবা মধ্যবর্তী দেশ হয়ে পাঠাচ্ছেন, যেনো উৎপাদনের প্রকৃত স্থান আড়াল থাকে।
পণ্যের নৈতিক উৎস ও ন্যায্য বাণিজ্য নিয়ে ইউরোপে সংবেদনশীলতা বাড়তে থাকায় এনিয়ে ইতিমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। উৎস গোপন রেখে লেবেলিং করা হলে তা ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করতে পারে এবং সম্ভাব্যভাবে বাণিজ্য বিধিমালা লঙ্ঘন করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
এছাড়া লেবেলিং প্রতারণার বিষয়টি বিশ্বব্যাপী খেজুর বাণিজ্যের দ্রুত সম্প্রসারণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার জটিলতার উৎস শনাক্তকরণ ও লেবেলিংয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ককে আরো তীব্র করেছে।
যে কারণে প্রতারণা করে মেডজুলের বিশ্ববাজার দখলে রাখতে চায়ছে ইসরাইল:
ইউরোপ বরাবরই ইসরাইলের সবচেয়ে বড় বাজার। অতি লাভজনক ও উচ্চমূল্যের মেডজুল খেজুরের ভোক্তাদের বড় অংশও ইউরোপের। এই বাজার হাতছাড়া হোক তা কোনোভাবেই চায়ছে না অবৈধ রাষ্ট্রটি। এছাড়া বৈশ্বিক বয়কটের প্রভাব সামাল দিতেও ভালো অবদান রাখছে ইউরোপে তাদের মেডজুল রপ্তানি।
এজন্য চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকা মেডজুল খেজুরের বিশাল বাজারে নিজেদের দখল বাড়াতে উল্টো ফিলিস্তিনের চির উর্বর জমিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানা বানাতে উঠে পড়ে লেগেছে অবৈধ রাষ্ট্রটি। পশ্চিম তীরের বিস্তীর্ণ খালি জমিকে ইসরাইলী জমিতে পরিণত করতে আইনও পাশ করা হয়। যা নিয়ে বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় উঠে।
গ্লোবাল মার্কেটের তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দিন দিন খেজুরের বিশ্ববাজার চক্রবৃদ্ধি হারে বড় হচ্ছে। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক খেজুর বাজারের মূল্য ছিলো ৩২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। যা ৬.১৪% চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে ২০২৬ সালে ৩৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে একপ্রকার নিশ্চিত পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ২০৩৪ নাগাদ যা গিয়ে দাঁড়াতে পারে ৫৫ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে!
এছাড়া বিশ্বের খেজুর বাজার এখনো মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলের উপর নির্ভরশীল। এই অঞ্চলের বার্ষিক খেজুর উৎপাদন সক্ষমতা ৯ মিলিয়ন টনেরও বেশি।
২০২৫ সালে সামগ্রিক ভাবে খেজুরের বিশ্ব বাজারের ৮৫ দশমিক ২৮ শতাংশ এই অঞ্চলের দখলে ছিলো। একই বছর বাজারমূল্য ছিলো ২৭ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৬ সালে বেড়ে ২৯ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এ অঞ্চলের প্রধান উৎপাদক ও ভোক্তা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে তিউনিসিয়া, ইরান, ফিলিস্তিন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক ও মিশর।
মিশর বিশ্বের শীর্ষ খেজুর উৎপাদক রাষ্ট্র। বছরে ১৭ লাখ টনের বেশি খেজুর উৎপাদন করে থাকে দেশটি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সৌদি আরব, যার উৎপাদন ১৫ লাখ টনেরও বেশি। তৃতীয় ও চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ইরান ও আলজেরিয়া। দেশ দুটি যথাক্রমে ১৩ লাখ ও ১১ লাখ টনের বেশি উৎপাদন করে।
সামগ্রিক উৎপাদনে মিশর ও সৌদি আরবের ধারেকাছে না থাকলেও উচ্চমূল্যের সংযোজনযুক্ত প্রিমিয়াম মেডজুল খেজুর রপ্তানির ক্ষেত্রে ইসরাইলও শীর্ষদের কাতারে চলে আসে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইসরাইল উৎপাদিত মেডজুল বাজারের চিত্র:
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নেদারল্যান্ডসে বিক্রি হওয়া খেজুরের প্রায় অর্ধেক এবং ফ্রান্সে এক-তৃতীয়াংশের বেশি ইসরাইলী উৎসের।
বিশেষজ্ঞরা জানান, নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্স ইউরোপে প্যাকেটজাত ও পুনরায় রপ্তানির কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। সেখান থেকে পণ্য জার্মানিসহ অন্যান্য ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশে বিতরণ করা হয়।
জার্মানির মোট খেজুর সরবরাহের প্রায় ২৫ শতাংশই সরাসরি ইসরাইল বা ইসরাইলের সাথে সম্পৃক্ত বলে ধারণা করা হয়।
ডেট লন্ডারিং কিংবা ইসরাইলের রপ্তানিকৃত খেজুর কতটা ইসরাইলের?
ইসরাইলী কৃষি সাময়িকী ‘লাহাকলাই’ জানায়, ইসরাইল বছরে প্রায় ৩৫ হাজার টন খেজুর রপ্তানি করে। যার মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইসরাইলী সীমান্তের ভেতরে—মূলত আরাভা উপত্যকায়—উৎপাদন হয় মাত্র প্রায় ৮ হাজার ৮০০ টন।
এই তথ্য থেকে বুঝা যায়, ইসরাইল কর্তৃক রপ্তানিকৃত খেজুরের প্রায় ৭৫ শতাংশই উৎপাদিত হয় দখলকৃত ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে গড়ে উঠা ইহুদিবাদীদের অবৈধ বসতি ও কৃষি জমিতে। যা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে শুধু অবৈধই নয়, বরং ব্যাপকভাবে অবৈধ।
ইসরাইল সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো রপ্তানির সময় উৎপাদনস্থল গোপন করার মাধ্যমে এই বিষয়টি চেপে যান, যা আমদানি-রপ্তানি ও উৎপাদনের মধ্যকার তথ্যে অসামঞ্জস্যতার কারণে ইতিমধ্যে বিশেষজ্ঞদের নজরে এসেছে। তারা এই প্রক্রিয়াকে ‘ডেট লন্ডারিং’ বা উৎস গোপন করে বাজারজাতকরণ বলে উল্লেখ করেছেন।
তাদের বক্তব্য, দখলকৃত অবৈধ বসতিতে উৎপাদিত খেজুর নেদারল্যান্ডস, মরক্কো, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা ফিলিস্তিনের লেবেলে ইউরোপের দেশগুলোতে বাজারজাত করছে ইসরাইল। অথচ ইসরাইলী বসতি থেকে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্দিষ্ট লেবেলিং বিধি রয়েছে, যা মেনে চলা আবশ্যক।
২০১৯ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ন্যায়বিচার আদালতের এক রায়ে বলা হয়েছিলো, ইসরাইলী বসতিতে উৎপাদিত পণ্যকে শুধু ‘ইসরাইলী পণ্য’ হিসেবে লেবেল করা যথেষ্ট নয়, বরং বসতির উৎস স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে, যেনো ভোক্তারা বিভ্রান্ত না হন।
খাত-সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিনিধির অভিযোগ, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বসতির পণ্য ফিলিস্তিনি সরবরাহ ব্যবস্থায় মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অন্যদের অভিযোগ, সরকারি ঘোষণার সঙ্গে প্রকৃত সরবরাহের অসামঞ্জস্যের সুযোগ নিয়ে অবৈধ বসতির উৎপাদিত পণ্যকে ফিলিস্তিনি ব্র্যান্ডে হিসেবে রপ্তানি করা হচ্ছে।
এর আগে ২০১৪ সালে ফিলিস্তিলের জাতীয় অর্থনীতি মন্ত্রণালয় ২০ টন ইসরাইলী খেজুরও জব্দ করেছিলো, যা ‘ফিলিস্তিনি পণ্য’ লেবেলে বিক্রির উদ্দেশ্যে আনা হয়েছিলো। পরবর্তী বছরগুলোতেও এধরনের আরো অনেক খবর পাওয়া গিয়েছিলো।
প্রতারণার আরো একটি কারণ:
ইসরাইলী গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অবৈধ রাষ্ট্রটির কৃষি খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। উৎপাদকরা এবিষয়ে সরকারকে সতর্ক করেছে। বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আকারে চলমান বয়কট আন্দোলনকে এর মূল কারণ হিসেবে দেখছেন তারা। পণ্য পরিবহন বিঘ্নিত হওয়াকেও এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তারা আরো জানান, ইসরাইলী পণ্যের ঐতিহাসিক গন্তব্যস্থল ইউরোপে ভোক্তাদের বয়কট আন্দোলন জোরদার ও তৃণমূল পর্যায়ে চাপের কারণে খুচরা বিক্রেতারাও তাদের কাছ থেকে পণ্য সরবরাহের ব্যাপারে পুনর্বিবেচনা শুরু করেছে।
ব্রিটেনের কো-অপ কোম্পানি ইতিমধ্যে ইসরাইল থেকে পণ্য সংগ্রহ বন্ধ করেছে। একই সঙ্গে বেলজিয়াম ও আয়ারল্যান্ডের মতো দেশগুলোতেও বয়কট আন্দোলন জোরালো থেকে অধিক জোরালো হয়ে উঠছে।
ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মেডজুলের পার্থক্য:
আল জাজিরার ভিডিও প্রতিবেদনে এক খেজুর বিশেষজ্ঞের বক্তব্য প্রচারিত হয়। যেখানে তিনি ইসরাইল উৎপাদিত খেজুরের বিচির মাঝখানের অংশে সাধারণত কালো সুতার মতো থাকে বলে উল্লেখ করেন।
এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, পর্যাপ্ত পরিমাণে পানির ব্যবস্থা না থাকায় ইসরাইল চাষের ক্ষেত্রে অপরিশোধিত পানি ব্যবহার করে থাকে। পক্ষান্তরে ফিলিস্তিনিদের উৎপাদিত খেজুরগুলোর বিচিতে কালো সুতার মতো কোনো অংশ থাকে না এবং তা প্রকৃতির স্বচ্ছ ও নির্মল পানি দিয়ে উৎপাদিত হয়। যার ফলে এর বাহিরের রঙ অনেক পরিস্কার থাকে এবং রসালোও বেশি হয়।












