spot_img
spot_img

আজ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী

আজ শনিবার (৩০ মে)। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে গভীর শোক ও শ্রদ্ধার দিন। ১৯৮১ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে শহীদ হন স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানায়ক, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সকাল ৬টায় রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশের দলীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা ও কালো পতাকা উত্তোলনের কর্মসূচি রয়েছে। সকাল ১১টায় শেরে বাংলা নগরে শহীদ জিয়ার মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, কবর জিয়ারত ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া অসহায় মানুষের মাঝে খাদ্যসামগ্রী ও বস্ত্র বিতরণের কর্মসূচিও রয়েছে।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে শুধু একজন সামরিক কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা বা রাজনীতিক হিসেবে দেখলে তার পূর্ণ পরিচয় ধরা পড়ে না। তিনি ছিলেন সংকটের সময় উঠে আসা এক নেতৃত্ব। রণাঙ্গনে যেমন সাহস দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় তেমনি শৃঙ্খলা, আত্মনির্ভরতা ও জাতীয় স্বাতন্ত্র্যের কথা বলেছেন। তার রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল দেশ, মানুষ, উৎপাদন ও স্বাধীন রাষ্ট্রের নিজস্ব পথ খোঁজার চেষ্টা।

জিয়াউর রহমান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি, বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি গ্রামে মাতুলালয়ে। তার বাবা মনসুর রহমান ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী ও কেমিস্ট। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মিতভাষী, শৃঙ্খলাপ্রিয় ও আত্মনির্ভরশীল। দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে তিনি করাচিতে যান। সেখানেই শিক্ষাজীবন শেষ করে ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে ভর্তি হন।

১৯৫৫ সালে কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। পরে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে খেমকারান সেক্টরে কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে তার সাহসিকতা ও নেতৃত্ব প্রশংসিত হয়। সামরিক জীবনের শুরু থেকেই তিনি পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও কঠোর পরিশ্রমের পরিচয় দেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করলে পূর্ব বাংলার মানুষ ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। সেই সংকটময় সময়ে চট্টগ্রামে অবস্থানরত মেজর জিয়াউর রহমান পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং দেশবাসীকে প্রতিরোধযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান।

তার কণ্ঠের সেই ঘোষণা বিপর্যস্ত জাতির সামনে সাহসের বার্তা হয়ে আসে। ঢাকায় গণহত্যা চলছে, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, মানুষ দিকনির্দেশনার অপেক্ষায়। এমন মুহূর্তে কালুরঘাট থেকে উচ্চারিত স্বাধীনতার ঘোষণা মুক্তিকামী মানুষের মনে নতুন শক্তি জাগায়। স্বাধীনতাযুদ্ধের সূচনালগ্নে জাতিকে প্রতিরোধের পথে দাঁড় করাতে এই ঘোষণা বড় ভূমিকা রাখে।

মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমান প্রথমে ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে রণাঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। যুদ্ধ পরিচালনা, পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে তার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার তাকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে।

স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা, রক্তক্ষয়ী পালাবদল ও রাষ্ট্রীয় সংকটের ভেতর দিয়ে তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন। ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লবের পর বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি জাতীয় রাজনীতির প্রধান চরিত্রে পরিণত হন। পরে ১৯৭৬ সালের ১৯ নভেম্বর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

রাষ্ট্র পরিচালনায় এসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একদলীয় শাসনের পর দেশে বহুদলীয় রাজনীতির পথ খুলে দেন। নিষিদ্ধ ও কোণঠাসা রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ দেন। সংবাদপত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে মতপ্রকাশের পরিসর তৈরি করেন। নির্বাচন, সংসদ, রাজনৈতিক দল ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক ধারায় ফেরানোর চেষ্টা করেন।

তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবদান ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা। তিনি জাতীয় পরিচয়কে শুধু ভাষা বা ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ইসলামী মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য, জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ভিত্তিতে তিনি বাংলাদেশের নিজস্ব পরিচয় ব্যাখ্যা করেন। তার কাছে জাতীয়তাবাদ ছিল রাষ্ট্র গঠনের দর্শন, জনগণকে এক সূত্রে বাঁধার চেষ্টা এবং স্বাধীন দেশের নিজের পথ ঠিক করার আহ্বান।

এই দর্শনের ভিত্তিতেই ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। বিএনপিকে তিনি একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। ডান, বাম ও মধ্যপন্থী নানা ধারার মানুষকে একটি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা ছিল তার। বিভক্ত সমাজে রাষ্ট্রের প্রশ্নে একটি বৃহত্তর ঐক্য গড়ার প্রয়াস ছিল এর পেছনে।

রাষ্ট্রচিন্তায় শহীদ জিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি গুরুত্ব। তার সময়ে সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ সংযোজন করা হয়। রাষ্ট্রনীতিতে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের নীতি যুক্ত হয়। মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক সংরক্ষণ ও শক্তিশালী করার বিষয়টিও রাষ্ট্রীয় নীতিতে স্থান পায়। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাস, ইতিহাস ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের একটি নতুন সমন্বয় তৈরি হয় তার সময়েই।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল তার উন্নয়ন ভাবনার মূল ভিত্তি। এতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, গ্রামীণ উন্নয়ন, সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, যুব উন্নয়ন, নারীর অংশগ্রহণ, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং আত্মনির্ভর অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তিনি রাজনীতিকে শুধু ক্ষমতার প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখেননি। রাজনীতিকে তিনি উৎপাদন, উন্নয়ন, শৃঙ্খলা ও জনগণের অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন।

খাল খনন কর্মসূচি, গ্রাম সরকার ভাবনা, গণশিক্ষা কার্যক্রম, যুব উন্নয়ন উদ্যোগ ও গ্রামীণ অর্থনীতি সক্রিয় করার প্রচেষ্টা তার শাসনামলের উল্লেখযোগ্য দিক। শহরকেন্দ্রিক ক্ষমতার রাজনীতির বাইরে তিনি মাঠে-ঘাটে সাধারণ মানুষের কাছে গেছেন। কৃষক, শ্রমিক, যুবক ও গ্রামীণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। তার “নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে হবে” আহ্বান ছিল আত্মনির্ভর রাষ্ট্র গঠনের একটি বাস্তব রাজনৈতিক বার্তা।

তার শাসনামলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্যশস্য উৎপাদনে অগ্রগতি, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পে উৎসাহ, রপ্তানি খাতের বিকাশ এবং বেসরকারি উদ্যোগের প্রসারে নতুন গতি আসে। প্রশাসনে শৃঙ্খলা, সেনাবাহিনীতে পেশাদারিত্ব এবং আইনশৃঙ্খলা পুনর্গঠনের চেষ্টা ছিল তার সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দিক। দীর্ঘ অস্থিরতার পর ক্লান্ত ও বিভক্ত একটি দেশকে তিনি উৎপাদনমুখী পথে ফেরাতে চেয়েছিলেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে নতুন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, চীনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিস্তার এবং দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা এগিয়ে নেওয়া ছিল তার পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ দিক। পরবর্তী সময়ে সার্ক প্রতিষ্ঠার যে আঞ্চলিক কাঠামো তৈরি হয়, তার প্রাথমিক ভাবনা ও উদ্যোগের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের নাম গভীরভাবে যুক্ত।

ব্যক্তিগত জীবনে শহীদ জিয়া ছিলেন সাদামাটা, সংযত ও পরিশ্রমী। রাষ্ট্রপতি হয়েও তিনি বিলাসী জীবনযাপন করেননি। ক্ষমতার আড়ম্বরের চেয়ে মানুষের কাছে যাওয়া, কাজের পরিবেশ তৈরি করা এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে সক্রিয় রাখাকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তার সততা, কর্মনিষ্ঠা ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তাকে দেশের বড় অংশের মানুষের হৃদয়ে আলাদা জায়গা করে দেয়।

১৯৮১ সালের ৩০ মে গভীর রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে কতিপয় সেনা সদস্যের হাতে শহীদ হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৪৫ বছর। এক সম্ভাবনাময় রাষ্ট্রনায়কের এই অকাল শাহাদাতে দেশ স্তব্ধ হয়ে পড়ে। রাজনীতি, রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষের জীবনে তিনি যে প্রত্যাশা তৈরি করেছিলেন, তা হঠাৎ থেমে যায় এক বেদনাময় রাতে।

তার জানাজার দিন ঢাকায় মানুষের ঢল নামে। জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় লাখো মানুষ তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হয়। অনেকেই কফিনের কাছে যেতে পারেননি। কিন্তু তারা হৃদয়ে ধারণ করেছেন শহীদ জিয়ার স্মৃতি। পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় তাকে শেরে বাংলা নগরে সমাহিত করা হয়। সেই শোকের জনসমুদ্র বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্মৃতিতে আজও এক গভীর আবেগের অধ্যায় হয়ে আছে।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মতভেদ আছে, বিতর্কও আছে। তবে স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা, বহুদলীয় রাজনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা, সংবিধানে ইসলামী মূল্যবোধের পুনঃস্থাপন, আত্মনির্ভর উন্নয়ন দর্শন, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ভাবনায় তার ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে তাকে স্বতন্ত্র স্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকীতে জাতি আজ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করছে গভীর শ্রদ্ধা, দোয়া ও কৃতজ্ঞতায়। যে রাষ্ট্রচিন্তা, আত্মনির্ভরতার আহ্বান ও জাতীয় স্বাতন্ত্র্যের বোধ তিনি রেখে গেছেন, তা এখনো বাংলাদেশের রাজনীতি ও জনমনে প্রাসঙ্গিক।

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ