spot_img

রাজনীতিতে আবেগ নয়, প্রয়োজন প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা: আনাস হক্কানী

ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানের জ্যেষ্ঠ সদস্য আনাস হক্কানী বলেছেন, রাজনীতি যে সংজ্ঞাতেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, সফল রাজনীতি শেষ পর্যন্ত যুক্তিবোধ, বাস্তবতা এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক উপলব্ধির ওপর নির্ভর করে। আবেগতাড়িত সিদ্ধান্তের বদলে রাজনীতিতে প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও সঠিক বিচারবোধ প্রয়োজন।

শুক্রবার (২১ আগস্ট) আফগান সংবাদমাধ্যম তোলো নিউজে প্রকাশিত আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও জনপরিসরের আলোচনা নিয়ে লেখা এক নিবন্ধে তিনি এসব কথা বলেন।

আনাস হক্কানী বলেন, রাজনীতিকে সাধারণত শাসন পরিচালনার শিল্প, ক্ষমতা ব্যবস্থাপনা, সুযোগ কাজে লাগানো কিংবা সমঝোতার প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়। তবে রাজনীতিকে যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, সফল হতে হলে যুক্তিবোধ, বাস্তবতা এবং পরিস্থিতি সঠিকভাবে বোঝার সক্ষমতা জরুরি।

তিনি বলেন, যেসব রাজনীতিবিদরা আবেগের দ্বারা পরিচালিত হন, তারা ধীরে ধীরে বাস্তব পরিস্থিতিকে যুক্তিসংগতভাবে মোকাবিলা করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। ঘটনাপ্রবাহ কোন দিকে যাচ্ছে কিংবা এর পরিণতি কী হতে পারে, তা বোঝার ক্ষমতাও তাদের কমে যায়। ফলে বিভিন্ন ঘটনা তাদের কাছে অপ্রত্যাশিত, আকস্মিক কিংবা হঠাৎ ঘটে যাওয়া বিষয় বলে মনে হয়।

আনাস হক্কানীর মতে, বাস্তবে অনেক রাজনৈতিক ঘটনা যতটা আকস্মিক মনে হয়, ততটা আকস্মিক নয়। যথাসময়ে, সতর্কতার সঙ্গে এবং আবেগের প্রভাবমুক্ত হয়ে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা গেলে ঘটনাপ্রবাহ কোন দিকে এগোচ্ছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই আগেভাগে বোঝা সম্ভব।

তিনি বলেন, বড় সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরই কেবল তার গুরুত্ব বোঝা যায়। তখন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সময় ও সম্পদ, দুটিই অনেক কম থাকে।

আধুনিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও একটি সমাজের নৈতিক মানদণ্ড, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং জনপরিসরের আলোচনার মান প্রতিফলিত করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আফগানিস্তানের পরিস্থিতি তুলে ধরে আনাস হক্কানী বলেন, কয়েক দশকের ধারাবাহিক যুদ্ধ, অস্থিতিশীলতা ও সামাজিক বিপর্যয়ের পর দেশটিতে এমন রাজনৈতিক সচেতনতা, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং নাগরিক আচরণের মানদণ্ড গড়ে উঠবে, যা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা পাওয়া সমাজগুলোতে দেখা যায়, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।

তিনি বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ধারার আফগান রাজনীতিবিদ, ভাষ্যকার ও সাধারণ মানুষের বক্তব্য, লেখা এবং অনলাইন কার্যক্রম দেখলে অল্প কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া বোঝা যায়, জনপরিসরের আলোচনার বড় একটি অংশ এখনো বিবেচনাপ্রসূত বিচারবোধের চেয়ে আবেগতাড়িত প্রতিক্রিয়ার দ্বারা বেশি প্রভাবিত।

তার ভাষায়, পারস্পরিক সম্মানের অভাবও প্রায়ই চোখে পড়ে। বিরোধী মত শোনার ধৈর্য কম এবং ন্যায়সংগত ও পরিমিত বিচার অনেক সময় সহজাত এবং আবেগতাড়িত প্রতিক্রিয়ার কাছে হার মানে।

আনাস হক্কানী বলেন, আফগানিস্তানের শিক্ষিত ও সচেতন জনগোষ্ঠীর ওপর জনপরিসরে ভিন্ন ধরনের বিতর্কের সংস্কৃতি গড়ে তোলার বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। প্রত্যেক মানুষেরই মত পোষণ ও নিজের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের অধিকার রয়েছে। তবে শুধু মত থাকাই যথেষ্ট নয়। অন্য পক্ষের কথাও শুনতে হবে, তারা কী বলছে তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে এবং মৌলিকভাবে দ্বিমত থাকলেও ন্যায়সংগত অবস্থান বজায় রাখতে হবে।

তিনি বলেন, অন্য কারও আবেগতাড়িত অবস্থান, একপেশে যুক্তি, অবাস্তব মূল্যায়ন কিংবা অন্যায্য বিচার যেন আমাদেরও একই আচরণে ঠেলে না দেয়। অন্যের বাড়াবাড়ির জবাব দিতে গিয়ে যদি আমরা নিজেদের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি, তাহলে যে আচরণের সমালোচনা করছি, শেষ পর্যন্ত আমরাও সেই আচরণই পুনরাবৃত্তি করি।

জনসমক্ষে বলা ও লেখা কোনো বিষয়ই তুচ্ছ নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিটি বক্তব্য, প্রতিটি ভাষণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিটি মন্তব্য কিংবা পোস্ট শুধু একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত মতামতই প্রকাশ করে না। সম্মিলিতভাবে এগুলো একটি সমাজের রাজনৈতিক সচেতনতা, বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্বতা ও সহনশীলতার মাত্রাও তুলে ধরে।

আনাস হক্কানী বলেন, শিক্ষিত ও অশিক্ষিত আফগানরা অনলাইনে কী লিখছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ও সংবাদ কনটেন্টের নিচে কী মন্তব্য করছেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শেয়ার করা টেলিভিশন অনুষ্ঠানে কী প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন এবং বড় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত নিবন্ধের নিচে কী লিখছেন, সেগুলো দেখলেই বিষয়টি বোঝা যায়।

তিনি প্রশ্ন রাখেন, এসব প্রতিক্রিয়া আমাদের রাজনৈতিক আলোচনার মান সম্পর্কে কী বলে?

আগস্ট মাসে আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিন আবারও সামনে এসেছে উল্লেখ করে তিনি জানান, একজন আফগান হিসেবে এসব দিনে তিনি বহু আফগান রাজনীতিবিদের মতামত শুনেছেন, তাদের লেখা পড়েছেন এবং তারা যে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন, তা থেকে অনেক কিছু শিখেছেন।

এ সময় পূর্ববর্তী সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ওয়াহিদ ওমরের সাম্প্রতিক কিছু লেখা ও বক্তব্য বিশেষভাবে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বলে জানান আনাস হক্কানী।

তিনি বলেন, এর কারণ এই নয় যে ওয়াহিদ ওমর যা বলেছেন, তার সবকিছুর সঙ্গে সবাইকে একমত হতে হবে। বরং উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে আবেগতাড়িত প্রতিক্রিয়া থেকে কিছুটা দূরে রেখে তুলনামূলকভাবে যুক্তিসংগত, ভারসাম্যপূর্ণ ও পরিমিত দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার তার প্রচেষ্টা।

আনাস হক্কানী বলেন, যখন আবেগতাড়িত অবস্থান ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে, তখন যুক্তিবোধ, ভারসাম্য ও পরিমিতিবোধের দিকে যেকোনো আন্তরিক প্রচেষ্টা স্বীকৃতি ও সম্মানের দাবিদার।

তিনি আরও বলেন, ২৪ আসাদ, অর্থাৎ ১৫ আগস্ট, জনগণকে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ এবং দিনটি পালন করার ক্ষেত্রে ইমারাতে ইসলামিয়া যে পরিসর দিয়েছিল, তা আগের বছরগুলোর তুলনায় বিস্তৃত ছিল। মানুষও বিভিন্নভাবে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করেছে। একইভাবে সরকার ২৮ আসাদ, অর্থাৎ ১৯ আগস্টও উল্লেখযোগ্যভাবে পালন করেছে।

আনাস হক্কানী বলেন, কয়েক দশকের বিদেশি হস্তক্ষেপ, সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতা আফগান সমাজে অনিবার্যভাবেই বেদনাদায়ক স্মৃতি এবং গভীর রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিভাজন রেখে গেছে। এ ধরনের মতপার্থক্য স্বাভাবিকভাবেই ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে একটি মৌলিক বাস্তবতা অপরিবর্তিত, আফগানিস্তান সব আফগানের অভিন্ন ঘর।

তিনি বলেন, এই দেশের মর্যাদা আমাদের সবার। আল্লাহ না করুন, এই ঘর যদি অপমানিত কিংবা অসম্মানিত হয়, ইতিহাস সেই অপমানকে শুধু একটি গোষ্ঠী, একটি সরকার কিংবা একটি রাজনৈতিক ধারার অপমান হিসেবে লিপিবদ্ধ করবে না। বরং তা আমাদের সবার জাতির ইতিহাসের অংশ হিসেবেই থেকে যাবে।

তার মতে, এই বাস্তবতাই আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের পাশাপাশি অভিন্ন মূল্যবোধ, পারস্পরিক সম্মান, ন্যায়সংগত আচরণ এবং যুক্তিসংগত আলোচনার ওপর ভিত্তি করে একটি সংস্কৃতিকেও শক্তিশালী করতে হবে।

নিজের স্মৃতিকথা নিয়ে আনাস হক্কানী জানান, প্রায় দেড় বছর ধরে তিনি ২০০১ সালে শুরু হয়ে ২০২১ সালের আগস্টে শেষ হওয়া বিশ বছরের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ও অভিজ্ঞতা নিয়ে স্মৃতিকথা লেখার কাজ করছেন।

তিনি বলেন, সৌভাগ্যক্রমে ওই সময়কালের একটি বড় অংশ এখন বই আকারে একত্র করতে পেরেছেন। তার কারাজীবনের স্মৃতিকথা আলাদা একটি কাজ এবং সেটিও প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

অদূর ভবিষ্যতে রাজনৈতিক স্মৃতিকথাটি প্রকাশের জন্য প্রস্তুত করে পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তবে ওই সময়কাল নিয়ে নিজের বিবরণকে চূড়ান্ত বক্তব্য হিসেবে দেখছেন না জানিয়ে আনাস হক্কানী বলেন, এটি আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের পরিস্থিতি, অভিজ্ঞতা ও পরিবর্তনের একটি বর্ণনা। একজন আফগানের চোখে দেখা এবং সমাজের একটি অংশের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করা একটি বিবরণমাত্র।

তিনি বলেন, তার আশা, নিজের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে তিনি সেই ইতিহাসের প্রতি ন্যায়সংগত থাকতে এবং তা লিপিবদ্ধ করার সঙ্গে যে দায়িত্ব জড়িত, সেটি পালন করতে পেরেছেন।

আনাস হক্কানী বলেন, মতপার্থক্য থাকবে এবং মানুষ পরস্পরের সঙ্গে দ্বিমতও পোষণ করবে। তবে আলোচনায় যদি যুক্তিবোধ, পরিমিতিবোধ, ন্যায়সংগত আচরণ ও পারস্পরিক সম্মান বজায় থাকে, তাহলে সেই মতপার্থক্যই বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের উৎস হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: তোলো নিউজ

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ