বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট সমাধানে সরকারের চেয়ে ভালো পরিকল্পনা দিতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে সমস্যা সমাধানে সরকারের চেয়ে ভালো পরিকল্পনা দিতে পারলে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে সরকার। একই সঙ্গে চলমান বিদ্যুৎ সংকটে মানুষের দুর্ভোগের জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি।
শনিবার (১৫ আগস্ট) সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রিয় ভাই-বোনেরা, একটি শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে, তখনও তার হাঁটতে শিখতে ১৮ মাসের মতো সময় লাগে। আপনাদের নির্বাচিত সরকারের বর্তমান বয়স মাত্র ছয় মাস। এই সময়ে আমরা কীভাবে আপনাদের উন্নয়নে কাজ করছি, আপনারা দেখেছেন।’
ফ্যাসিবাদের সময় দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি কীভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। কীভাবে মেগা প্রজেক্টগুলো নিজেদের লোক দিয়ে চার-পাঁচগুণ বেশি টাকা দিয়ে দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করে দেওয়া হয়েছে। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরেকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা হয়েছিল। সে সময় মানুষকে বাধ্য করা হয়েছিল সেই দেশে গিয়ে চিকিৎসা নিতে।’
তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদের সরকার দেশের শিক্ষাখাতকে ধ্বংস করেছিল, কৃষি ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়েছিল এবং মানুষের কথা বলার অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছিল। এসবের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ ফুঁসে ওঠে। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে মানুষ সেই সরকারের পতন ঘটায়। এরপর দেশের মানুষ ভোটের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের সরকার গঠন করেছে।
নির্বাচনের আগে বিএনপির দেওয়া ৩১ দফার কথা স্মরণ করিয়ে তিনি বলেন, ‘এই ৩১ দফার মধ্যে আমরা বলেছি, নির্বাচিত হলে কীভাবে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, কীভাবে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই। শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের কথা বলেছি। নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে তাদের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই সেই মাঠ, নির্বাচনের পর এই মাঠেই আমরা আমাদের প্রথম প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছি। আমরা মা-বোনদের ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার মাধ্যমে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছি। আমরা কৃষক ভাইদের পাশে দাঁড়িয়েছি কৃষক কার্ড দিয়ে ও ১০ হাজার টাকা ঋণ মওকুফ করে। সরকার গঠনের পর প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই আমরা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছি। দেশের ১৩ লাখ কৃষকের কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে।’
বাংলাদেশকে কৃষিপ্রধান দেশ উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, পাশের দেশ বাঁধ তৈরি করে পানির সমস্যা সৃষ্টি করেছে। এর সমাধানে নির্বাচনে জয়ের পর শহীদ জিয়ার খাল খনন কর্মসূচি আবার শুরু করার কথা ছিল।
তিনি বলেন, ‘সরকার গঠনের পর এক মাসের মধ্যে যেমন ফ্যামিলি কার্ড করেছি, তেমনি খাল খনন কর্মসূচিও শুরু করেছি। এই ছয় মাসে আমরা প্রায় ৯০০ কিলোমিটার খাল খনন করেছি। এর মাধ্যমে দেশের অনেক উপজেলার মানুষ পানির সুবিধা পাচ্ছেন, কৃষকরা পাচ্ছেন সেচের সুবিধা।’
দেশে গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশ ৭১ সালে স্বাধীন হয়েছে। গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খেয়েছে। সব সময় আমরা বলেছি, গণতন্ত্রের কার্যক্রম দেশে চালু রাখতে পারলে জবাবদিহিতা থাকবে।’
তিনি বলেন, জবাবদিহিতা থাকলে দেশের মানুষের জন্য ভালো কাজ করা সম্ভব হবে। কারণ জবাবদিহিতার কারণে সরকার এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, যেগুলোতে মানুষের ও দেশের উপকার হয়।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলে বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের বেশির ভাগ শিশু সরকারি প্রাথমিক স্কুলে পড়ে। সারা দেশে সরকারি প্রাইমারি স্কুলগুলোতে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ শিশু পড়াশোনা করে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তাদের প্রত্যেককে বছরে একটি করে নতুন স্কুল ড্রেস দেব। একই সঙ্গে ছোট ছোট বাচ্চাদের স্কুল ব্যাগও দেব। সেটি শহরে হোক বা গ্রামে। ইনশাআল্লাহ আগামী এক মাসের মধ্যে এই কার্যক্রম শুরু হবে।’
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই সরকারকে বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচিত করেছে। তাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের জন্য কাজ করা। আমরা প্রত্যেকটি উপজেলা হাসপাতালকে প্রথমে ৫০ শয্যা থেকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিলেও তিন দিন আগে সেটি ১৫১ শয্যায় রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের ৫০৩টি উপজেলা হাসপাতালে এ ব্যবস্থা করা হবে, যেখানে মানুষ তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিতে পারবে।’
ফ্যাসিবাদের সরকার দেশের অর্থনীতিসহ প্রতিটি ব্যবস্থাকে বিধ্বস্ত করে গেছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষ এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশকে গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য নির্বাচিত সরকার হিসেবে তারা দিন-রাত পরিশ্রম করছেন।
বিদ্যুৎ সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী সরকার বিদ্যুৎ সেক্টরেই প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা বিভিন্নভাবে দেনা করে রেখে গেছে। আমি জানি, বিগত কিছুদিন ধরে দেশের মানুষ বিদ্যুতের কষ্ট পাচ্ছে।’
গ্যাস খাতের পরিস্থিতি তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘গ্যাস বাংলাদেশের একটি প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল। বাংলাদেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ যে গ্যাসকূপগুলো রয়েছে, বিগত ১৭ বছর স্বৈরাচাররা একটি গ্যাসকূপও নতুন করে খনন করেনি বা করতে দেয়নি। তারা এই পুরো সেক্টরটিকে বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিল।’
তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বাপেক্স দেশের মাটিতে গ্যাস অনুসন্ধান ও সংরক্ষণ কার্যক্রম দ্রুত শুরু করবে, যাতে গ্যাসকূপ খননের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের মানুষের হাতে থাকে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে মূল্যবান এই গ্যাসের একটি বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। জাহাজের মাধ্যমে এনে গ্যাস সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জাহাজের সংখ্যা মাত্র দুটি। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় আরেকটি জাহাজের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু পরে সেটি বাতিল করা হয়।
তিনি বলেন, ‘আজকের দুটি জাহাজের একটিতে হঠাৎ দুর্ঘটনা ঘটার কারণে গ্যাসের এই সমস্যা দেখা দিয়েছে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘এরই মধ্যে কারিগরি ত্রুটি সারানো হয়েছে। আশা করি, ইনশাআল্লাহ আল্লাহর রহমত থাকলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে গ্যাসের সমস্যা অনেকাংশে কমে আসবে। সারা বাংলাদেশের মানুষ যে বিদ্যুতের কষ্ট পাচ্ছেন, আমি আন্তরিকভাবে তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। কিন্তু আমরা কাজ করছি যত দ্রুত সম্ভব মানুষকে এই কষ্টের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য।’
১৯৯১ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে আপনারা ৯১ সালে এই আসন থেকে নির্বাচিত করেছিলেন। ৯১ সালে তিনি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পরে আমরা দেখেছি, ফ্যাসিবাদকে মানুষ এই দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে। তারা বলেছিল, এক মিনিটের জন্য বিএনপি সরকারকে শান্তিতে থাকতে দেবে না। তারা বিভিন্ন অরাজকতা সৃষ্টি করে সেদিন সরকারকে ব্যর্থ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ৯১ সালেও বাংলাদেশের মানুষের সমর্থন ছিল বিএনপির পাশে। সেই জন্য সরকারকে তারা ব্যর্থ করতে পারেনি।’
সাম্প্রতিক বিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচির সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, ‘একই রকম আওয়াজ ইদানীং আবার কিছু রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে শোনা যাচ্ছে। আমরা দুদিন আগে দেখলাম, একটি রাজনৈতিক দলের কিছু সদস্য প্রতিবাদ করছে, “গ্যাস দে, বিদ্যুৎ দে”, হারিকেন সামনে নিয়ে বসে আছে। আপনারা ছবিটা দেখেছেন। হারিকেন সামনে, আর পেছনে কিন্তু ফ্যান চলছে। এই হচ্ছে তাদের হঠকারিতা।’
তিনি বলেন, ‘তাদের বন্ধু-বান্ধব, তাদের সহকর্মীরাও তো সরকারের দায়িত্বে ছিল। তখন তারা কী করেছিল? তৃতীয় জাহাজের অনুমতি তারাই বাতিল করেছিল। তাদের সরকারই বাতিল করেছিল। এখন আবার আমাদের নতুন করে সবকিছু করতে হচ্ছে।’
গ্যাস সংকট মোকাবিলায় তৃতীয় জাহাজ আনার উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ তৃতীয় জাহাজটি চলে এলে গ্যাসের সমস্যা অনেকাংশে কমে যাবে। তবে এর জন্য অবশ্যই আমাদের ধৈর্য ধারণ করতে হবে। কারণ এই জাহাজগুলো বানাতে যথেষ্ট সময় প্রয়োজন হয়। পৃথিবীর নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশে এই জাহাজ তৈরি হয়। অনেক দামি জাহাজ এগুলো।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাইনিজদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা চেষ্টা করছে দ্রুত জাহাজ তৈরি করে বাংলাদেশে পাঠাতে। এর মধ্যে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে কথা বলেছি। তারাও চেষ্টা করছে আমাদের গ্যাসের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে।’
দেশের জ্বালানি সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সবার উদ্দেশ্যে বলতে চাই, বিএনপি জনগণের জন্য কাজ করছে। বিএনপির পরিকল্পনা রয়েছে জনগণের জন্য। ইনশাআল্লাহ আগামী সংসদে আগামী ১০ বছর আমরা কীভাবে এই দেশের মানুষের জ্বালানি সমস্যার সমাধান করব, সেই পরিকল্পনা দেব।’
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘আজকে এই সব রাজনৈতিক দলকে পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, জনগণের প্রতি আপনাদের দায়িত্ব থাকলে জনগণের সামনে আপনাদের পরিকল্পনা নিয়ে আসুন। আমি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলাম, দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা সমাধানে সরকারের চেয়ে ভালো পরিকল্পনা দিলে বা আগামী ছয় মাসের মধ্যে সমস্যা সমাধান করতে পারলে তাদের প্রত্যেকটি পরিকল্পনা আমরা বাস্তবায়ন করব।’
তিনি বলেন, ‘আর শুধু জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য গুজব ছড়ালে অবশ্যই তাদের জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।’
বক্তব্যের শেষ দিকে তারেক রহমান বলেন, ‘আজ আমি কী পেলাম, সেটি বড় কথা নয়। দেশকে, দেশের মানুষকে আমি কী দিতে পারলাম, সেটি বড় কথা। আসুন, এ কথাকে মনে ধারণ করে, এই কথার ওপর শপথ গ্রহণ করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে হাত তুলে মোনাজাত করি।’
তিনি বলেন, ‘দেশ গঠনের যে পথ আমাদের শহীদ জিয়া দেখিয়ে গিয়েছেন, যে পথে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে চলেছেন, আমরা সেই পথে দেশকে ধাবিত করতে চাই। বাংলাদেশকে সেই পথে এগিয়ে নিতে চাই। জননেত্রী খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিনে এই হোক আমাদের শপথ। এটাই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা।’
অনুষ্ঠানে ঢাকা-১৭ আসনের বিভিন্ন অঞ্চলের নেতারা বক্তব্য দেন। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, ঢাকা-১৭ আসনের প্রতিনিধি ও প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-২ আব্দুর রহমান সানী প্রমুখ।










