ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির চুক্তি করার জন্য দেশটিকে ১৫ দফা আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাকিস্তানের মাধ্যমে সেই প্রস্তাব তেহরানের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে বুধবার (২৫ মার্চ) খবর প্রকাশ হয়েছে।
এরপরই জানা গেছে, সেই প্রস্তাব সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। এর আগে ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলে দাবি করলেও ইরান স্পষ্ট করে বলেছিল, কোনো যোগাযোগই হয়নি।
বুধবার (২৫ মার্চ) ট্রাম্পের ১৫ দফার তথাকথিত শান্তি পরিকল্পনা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং যুদ্ধ বন্ধের জন্য নিজের সার্বভৌম ও কৌশলগত শর্তগুলো সামনে এনেছে তেহরান।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরান তার শান্তি পরিকল্পনার প্রধান বিষয়গুলোতে, যেমন পারমাণবিক অস্ত্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করার প্রশ্নে, সম্মত হয়েছে। তবে তেহরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, মধ্যস্থতাকারীদের কাছে তারা স্পষ্ট করেছে যে ট্রাম্পের পরিকল্পনা তাদের কাছে মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।
ইরানি আইনপ্রণেতারা এর পরিবর্তে নিজস্ব একটি চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছেন। সেখানে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের পূর্ণ কর্তৃত্ব এবং বিদেশে তাদের মিত্রশক্তিগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস, যারা বর্তমানে তেহরানের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম প্রধান শক্তি, ঘোষণা করেছে যে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সব মার্কিন ঘাঁটি প্রত্যাহার এবং ইরানের ওপর হামলার ক্ষতিপূরণ না দেওয়া পর্যন্ত তারা নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসবে না।
মার্কিন বাহিনীর পূর্ণ প্রত্যাবর্তনের পাশাপাশি ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহকারী গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচল পথ হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। এই পরিবর্তনের ফলে মিশর যেভাবে সুয়েজ খাল থেকে শুল্ক আদায় করে, ইরানও সেভাবে এই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলো থেকে ফি সংগ্রহ করতে পারবে।
তেহরানের এই দাবিগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে, ইরানের ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং একটি বৈধ নতুন আয়ের উৎস নিশ্চিত করা। এছাড়া ইরান এই যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তির পাশাপাশি লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের সামরিক অভিযান বন্ধের দাবিও জানিয়েছে।
এই দাবিতে পরমাণু কর্মসূচির কথা সরাসরি উল্লেখ না করা হলেও বলা হয়েছে, ইরানকে তার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বজায় রাখার অনুমতি দিতে হবে এবং এটি সীমিত করার বিষয়ে কোনো আলোচনা করা হবে না।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন মার্কিন কর্মকর্তা ইরানের এই দাবিগুলোকে ‘অবাস্তব’ বলে অভিহিত করেছেন। ইসরাইলের চ্যানেল ১২-এ প্রকাশিত ট্রাম্পের প্রস্তাবগুলোর সঙ্গে ইরানের এই দাবিগুলোর সরাসরি সংঘাত রয়েছে।
প্রেস টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে একজন ইরানি কর্মকর্তা ট্রাম্পের দাবিগুলোকে বাস্তববিবর্জিত বলে উল্লেখ করেছেন।
তিনি জানান, ইরান নিজস্ব শর্ত পূরণ সাপেক্ষে যুদ্ধ সমাপ্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। বর্তমানে ইরান ও আমেরিকা সরাসরি আলোচনা না করায়, একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নির্ভর করছে।
ট্রাম্পের প্রস্তাবে যা ছিল
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরানকে দেওয়া ১৫টি দাবির মধ্যে ১৪টির উল্লেখ রয়েছে।
ইরানকে তাদের বিদ্যমান পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে হবে। ইরানকে অঙ্গীকার করতে হবে যে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের চেষ্টা করবে না। ইরানের ভূখণ্ডে কোনো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করা যাবে না। ইরানকে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার কাছে হস্তান্তর করতে হবে। নাতানজ, ইসফাহান ও ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করতে হবে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে পূর্ণ প্রবেশের অধিকার দিতে হবে।
ইরানকে তাদের আঞ্চলিক প্রক্সি মডেল বা মিত্রশক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা কাঠামো ত্যাগ করতে হবে।
ইরানকে তাদের প্রক্সি বা মিত্রশক্তিগুলোকে অর্থায়ন, নির্দেশনা ও অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। হরমুজ প্রণালি অবশ্যই উন্মুক্ত রাখতে হবে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির পাল্লা ও পরিমাণ, উভয়ই সীমিত করতে হবে এবং ইরানকে তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার কেবল আত্মরক্ষার কাজে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
বিনিময়ে ইরান যা পেতে পারে
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলোর সমাপ্তি, ইরানের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিকে এগিয়ে নিতে মার্কিন সহায়তা এবং শর্ত পালনে ব্যর্থ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের ‘স্ন্যাপব্যাক’ পদ্ধতি বাতিলের কথাও এতে ছিল।
সূত্র : নিউ ইয়র্ক পোস্ট










