বাংলাদেশে মানুষের আইনের কবর রচনা করে কুরআনের আইন প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও দলের নায়েবে আমীর মুজিবুর রহমান।
বুধবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ দাবি জানান।
মুজিবুর রহমান বলেন, “আমরা আল্লাহর আইন চাই। আপনারা আল্লাহর আইনের বিরোধিতা করবেন না বলেছেন। অতএব আসুন, বাংলাদেশে মানুষের আইনের কবর রচনা করে কুরআনের আইন প্রতিষ্ঠা করি।”
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “ফখরুল ইসলাম সাহেব বলেছিলেন, তারা শরিয়তের আইন বিশ্বাস করেন না। পরে অবশ্য নির্বাচনের আগে আত্মসমর্পণ করে বলেছেন, শরিয়তের বিরুদ্ধে কোনো আইন আমরা পাস করব না। ধন্যবাদ উনাকে, অন্তত তওবা করে ফিরে এসেছেন।”
দেশে ইসলামী আইন চালুর জন্য একটি ইসলামী বোর্ড গঠনের দাবি জানিয়ে জামায়াতের এই এমপি বলেন, “জাতীয় সংসদে থাকা মাদরাসা পাস করা এমপি এবং বাইরে যত মাজহাবযুক্ত ওলামায়ে কেরাম আছে, এমনকি আহলে হাদিস আছে, সব ওলামাকে নিয়ে একটা ইসলামী বোর্ড গঠন হবে। যারা ইসলামী আইন চালু করার জন্য আমাদেরকে পরামর্শ দেবে এবং দেশে সেই আইন কার্যকর হবে।”
আখেরাতের চিন্তা সামনে রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের প্রথম চিন্তা হচ্ছে, দুনিয়াতে আমরা কেউ থাকব না। মরার পরে আমাদের আসল জায়গা। এখানে যা আলোচনা হচ্ছে, সব দুনিয়া কেন্দ্রিক। আখেরাতে কী হবে, চিন্তা কারও মনে নাই।”
সূরা আলে ইমরানের ১৮৫ নম্বর আয়াতের অনুবাদ তুলে ধরে তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে পারল, সেই সত্যিকার সফল হবে। আর জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল, সেই সত্যিকার সফল হতে পারবে।”
সংসদ ভবনের লবিতে লেখা ‘আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও ঈমান’ প্রসঙ্গ তুলে মুজিবুর রহমান বলেন, “সংসদ লবিতে ঢোকার সময় আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা এবং ঈমান এটা দেখার পরে মনে হয়, আল্লাহর প্রতি যদি ঈমান থাকে, তাহলে তো আমাদের আইনের উৎস আল কুরআন। কুরআনের বিধান বাংলাদেশে চালু হওয়া উচিত ছিল।”
তিনি বলেন, “শতকরা ৯০ জন মানুষ কুরআনে বিশ্বাস করে। এই কুরআনে যে বিধানগুলো আছে, ৬৬৬৬টি আয়াতের মধ্যে ১ হাজার আয়াত আছে হ্যাঁ-বোধক আইন, ১ হাজার আয়াত আছে না-বোধক আইন। যেগুলো বাংলাদেশে কায়েম করতে হবে। এটা আমাদের দাবি।”
সূরা হজের ৪১ নম্বর আয়াতের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, “যারা রাষ্ট্রক্ষমতা পাবে, তারা দেশে নামাজ চালু করে মানুষের চরিত্র ভালো করে দেবে এবং জাকাত চালু করে মানুষের ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব দেশ থেকে বিতাড়িত করবে। ভালো কাজ করে মানুষকে শান্তিতে থাকতে দেবে, খারাপ কাজ বন্ধ করে অশান্তির আগুন থেকে মানুষকে রক্ষা করবে।”
মুজিবুর রহমান বলেন, “দুর্ভাগ্য, আওয়ামী লীগ এসেছে ছয়বার, বিএনপি পাঁচবার, জাতীয় পার্টি দুইবার। এতগুলো সরকার এসেছে, কিন্তু জাতীয় সংসদে কুরআনের একটি আইনও চালু করেনি। সবচেয়ে লজ্জা, সবচেয়ে দুঃখজনক কথা হলো, আমরা চাই, এদেশে কুরআনের আইন চালু করে মানুষকে মুক্তি দেব।”
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলব, আপনাকেও জিজ্ঞাসা করা হবে, আমাকেও করা হবে, বাংলাদেশে কেন নামাজ চালু করা হলো না? কেন জাকাত চালু করে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব দেশ থেকে দূর করা হলো না? কেন ভালো কাজ চালু করে মানুষকে শান্তিতে থাকতে দেওয়া হলো না? কেন খারাপ কাজগুলো বন্ধ করে অশান্তি থেকে মানুষকে রক্ষা করা হলো না?”
তিনি আরও বলেন, “আমি আপনার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীসহ আইনমন্ত্রী, পাশে বসে আছেন, তারা জবাব দেবেন এবং বলবেন, তাদের দায়িত্বটা কী।”
দেশকে চাঁদাবাজমুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে মুজিবুর রহমান বলেন, “আমাদের দেশে সুদ, ঘুষ, মদ, জুয়া, জিনা-ব্যভিচার, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি যারা করে, এরা কোনো দলের লোক না। কিন্তু বলা হয়, একদল চাঁদাবাজি করে পালিয়ে গেছে, আরেক দল চাঁদাবাজি করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এটা বলার পরে কোনো কোনো দল যদি রিঅ্যাকশন করে, তখন তো বোঝা যায়, এই চাঁদাবাজদেরকে দলের সদস্য হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “চাঁদাবাজ কোনো দলের সদস্য হতে পারে না। চাঁদাবাজ চাঁদাবাজই। তাদের ধরতে হবে, গ্রেপ্তার করতে হবে। বাংলাদেশকে চাঁদাবাজমুক্ত করতে হবে।”
সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়ে মুজিবুর রহমান বলেন, “আমরা একটা ভোটের শপথ নিলাম, আরেকটা ভোটের শপথ নিলাম না, তাহলে জনগণের ভোটের সঙ্গে ভালো আচরণ করা হলো না। জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হলো।”
তিনি বলেন, “যদি গণভোট বাতিল হয়ে যায়, তাহলে সংসদ সদস্য পদও বাতিল হওয়ার আশঙ্কা আছে বলে বর্তমান যারা আইনজ্ঞ, তারা এটা পর্যালোচনা করছেন। শেষে আমও যাবে, ছালাও যাবে। তাই শপথ নিয়ে কার্যকর করতে হবে।”
মুজিবুর রহমান আরও বলেন, “প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, অক্ষরে অক্ষরে এটা পালন করবেন। তাহলে শপথটা নিলে অসুবিধাটা কোথায়? আমরা তো বুঝি না। এজন্য শপথ নিয়ে এটা সমাধান করতে হবে।”
জান্নাতের টিকিট বিক্রির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “টিকিট বিক্রির একটা কথা হয়েছে। কুরআনের একটি আয়াতকে কেন্দ্র করে ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। আল্লাহ তায়ালা সূরা তওবার ১১১ নম্বর আয়াতে বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা জান-মালকে কিনে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে। এটা আল্লাহর কথা। আপনি জান-মাল দেবেন, বিক্রি করবেন, জান্নাতে যেতে পারবেন। জান-মাল আল্লাহর পথে দেবেন না, আপনার কপালে জান্নাত হবে না। এটা আল্লাহর কথা, এটা মানুষের কথা না।”
তিনি আরও বলেন, “আমি চ্যালেঞ্জ দিলাম, জামায়াতে ইসলামীর কোনো নেতা বলেছে, আমার কাছে জান্নাতের টিকিট আছে, বিক্রি করছি? প্রধানমন্ত্রীকে জবাব দিতে হবে, কেন তিনি এটা বলছেন।”











