বুধবার | ৭ জানুয়ারি | ২০২৬
spot_img

১৭ বছর বয়সি তাহরিমাকে ২০ বছর দেখিয়ে কারাগারে পাঠায় পুলিশ

চাঁদাবাজির মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার হওয়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা তাহরিমা জান্নাত সুরভীর বয়স ১৭ বছর, কিন্তু ২০ বছর দেখিয়ে তাকে কারাগারে পাঠায় পুলিশ।

মামলার নথি অনুযায়ী, সুরভীর বিরুদ্ধে দায়ের করা এজাহার ও পুলিশের প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে তার বয়স ২০ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। বয়স সংক্রান্ত এই বিভ্রান্তির কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে শিশু আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।

সোমবার (৫ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ-১ আদালতের বিচারক অমিত কুমার দে তাহরিমা জান্নাত সুরভীর জামিন মঞ্জুর করেন।

এর আগে দুপুরে গাজীপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক তার দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন। এই আদেশের পরপরই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যোদ্ধা ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয় এবং তারা আদালত এলাকায় বিক্ষোভ করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সন্ধ্যায় উচ্চতর আদালত তার রিমান্ড বাতিল ও জামিন মঞ্জুর করেন।

জানা গেছে, তাহরিমা জান্নাত সুরভী গাজীপুরের টঙ্গী থানার পূর্ব গোপালপুর এলাকার মো. সেলিম মিয়ার মেয়ে। তিনি বর্তমানে ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির (উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষ) শিক্ষার্থী। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। জন্মসনদ অনুযায়ী সুরভীর জন্ম ২০০৮ সালে, অর্থাৎ আইনগতভাবে তিনি এখনো শিশু।

তবে ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানায় দায়ের করা চাঁদাবাজির মামলার এজাহারে বাদী সাংবাদিক নাঈমুর রহমান দুর্জয় সুরভীর বয়স ২১ বছর উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে ২৫ ডিসেম্বর টঙ্গীর নিজ বাসা থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে এবং বয়স ২০ বছর দেখিয়ে কারাগারে পাঠায়।

আইনি প্রেক্ষাপট: শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর রিমান্ড আবেদন করা যায় না এবং তাদের সাধারণ কারাগারে রাখারও বিধান নেই। অথচ সোমবার দুপুরে গাজীপুর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ সুরভীর দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন। পরে এই আদেশের বিরুদ্ধে দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করা হলে শুনানি শেষে রিমান্ড বাতিল ও জামিন মঞ্জুর করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাবেক জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারসহ অনেকেই দাবি করেছেন, জন্মসনদ অনুযায়ী সুরভী অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও পুলিশ তাকে প্রাপ্তবয়স্ক দেখিয়ে রিমান্ড চেয়েছে, যা শিশু আইনের চরম লঙ্ঘন।

এনসিপির কালিয়াকৈর উপজেলা শাখার প্রধান সমন্বয়ক দেওয়ান মাহবুব আলম পনির বলেন, ‘আমি দীর্ঘ সময় ধরে সুরভীকে চিনি। তার কথাবার্তা ও আচরণে কখনোই তাকে প্রাপ্তবয়স্ক মনে হয়নি। বয়স ১৭ হলেও শারীরিক গঠনের কারণে তাকে প্রাপ্তবয়স্ক মনে হতে পারে, কিন্তু আইনের ক্ষেত্রে জন্মসনদই মুখ্য।’

সুরভীর বাবা মো. সেলিম মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার মেয়ের জন্ম ২০০৮ সালে। ২০১৮ সালে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন থেকে তার জন্মসনদ তোলা হয়েছে। সে এখনো শিক্ষার্থী এবং আইনত শিশু।’

কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার নাছির উদ্দিন বলেন, ‘পরিবার আগে জন্মসনদ দিলে হয়তো এই জটিলতা তৈরি হতো না। যেহেতু তিনি মাইনর (অপ্রাপ্তবয়স্ক), আদালত তাকে জামিন দিয়েছেন। তদন্ত প্রতিবেদনে আমরা তার প্রকৃত বয়স উল্লেখ করব।’

তিনি আরও যোগ করেন, বয়স ১৭ হলে রিমান্ড বা সাধারণ কারাগারে নেওয়ার বিধান নেই; বিষয়টি আগে জানানো হলে হয়তো তাকে এতটা হয়রানি পোহাতে হতো না।

spot_img
spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ